আফরিন কলি ঢাকা প্রতিনিধি: শিক্ষকদের এমপিওভুক্তিতে সব কাগজপত্র ঠিক থাকলে ১০, কর্মচারীর ক্ষেত্রে ৫ থেকে ১০, উচ্চতর স্কেল পেতে ৫ থেকে ১০, শিক্ষক-কর্মচারীর বকেয়া বেতন পেতে, নাম ও জন্ম তারিখ সংশোধনে এবং এমপিও পরিবর্তন বা কর্তনে ৫ থেকে ২০ পর্যন্ত।
এভাবেই প্রতিটি লেনদেনে সাংকেত চিহ্ন ব্যবহার করেন রাজধানীর মিরপুরের দারুস সালাম রোডে অবস্থিত মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার ঢাকা আঞ্চলিক উপ-পরিচালকের কার্যালয়ের অফিস সহায়ক মো: আব্দুল মোতালেব। উপ-পরিচালকের পিএ পরিচয়ে এভাবে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের পকেট কেটে কার্যালয়টিকে ঘুষের হাটে রূপান্তর করেছেন তিনি। গড়েছেন অঢেল সম্পদ।
আরো পড়ুন:
ঈদের আগেই এমপিও শিক্ষকদের শতভাগ উৎসব ভাতা!
সূত্র জানায়, শিক্ষক এপিওভুক্তিতে সব কাগজপত্র ঠিক থাকলে ১০ হাজার টাকা। কাগজ ঠিক না থাকলে ৫০ হাজার টাকা বা তারও বেশি নেওয়া হয়। কর্মচারীর এমপিওভুক্তির ক্ষেত্রে পাঁচ হাজার থেকে ২০ হাজার, উচ্চতর স্কেল পেতে তিন থেকে পাঁচ হাজার, শিক্ষক-কর্মচারীর বকেয়া বেতন পেতে পাঁচ হাজার থেকে ১৫ হাজার এবং নাম ও জন্ম তারিখ সংশোধনের ক্ষেত্রে পাঁচ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা নেন তিনি।
অবৈধ এই সব কার্যক্রম চলে ডিডির নাম বিক্রি করে। তবে কার্যালয়টির উপ-পরিচালক বলছেন, শিক্ষক-কর্মচারীদের সব কাজ হয় অনলাইনে এখানে আর্থিক লেনদেনের সুযোগ নেই। কেউ যদি টাকা দাবি করে তাহলে লেনদেন না করার জন্য অনুরোধ জানান তিনি। একই সাথে নির্দ্বিধায় তাকে অবহিত করার জন্যও সবাইকে আহ্বান করেন তিনি।
আরো পড়ুন:
ফেব্রুয়ারির বেতন ও উৎসব ভাতা আলাদা আলাদা, সময় জানালেন মাউশি ডিজি
অফিস সহায়ক মোতালেবের হাতে লেখা একাধিক চিরকুটে সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহার করে টাকা লেনদেনের নথি শিক্ষাবার্তা’র হাতে এসেছে। নথি ঘেটে দেখে যায়, ফরিদপুর সদর উপজেলার চর মাধবদিয়া ইউনাইটেড উচ্চ বিদ্যালয় ও খাসচর মানাইর নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মাদারীপুরের শিবচরের কাঠাল বাড়ি উচ্চ বিদ্যালয়, রাজবাড়ীর পাংশার পুঁইজোর এ,জি,এম, উচ্চ বিদ্যালয়, ঢাকার কেরানীগঞ্জের জাজিরা উচ্চ বিদ্যালয়, গাজীপুরের কালিকৈরের রতনপুর হাজী আনোয়ার উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়, মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানের বাসাইল উচ্চ বিদ্যালয়, মানিকগঞ্জের তালেবপুর আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়, মাদারীপুরের কাঠাল বাড়ি উচ্চ বিদ্যালয়, গাজীপুরের বাপতা মল্লিক বাড়ী উচ্চ বিদ্যালয়, গাজীপুর সদরের হাতিয়া হাজী ছবির উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়, গাজীপুরের ছোট দেওড়া অগ্রণী উচ্চ বিদ্যালয়, ফরিদপুরের মধুখালীর মিরের হাটিয়া উচ্চ বিদ্যালয়, কাল পোহা উচ্চ বিদ্যালয়, গোপালগঞ্জের বিষ্ণু জনকল্যাণ উচ্চ বিদ্যালয়, মাটিপাড়া ছমির উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়, রাজবাড়ীর মর্জ্জৎকোল হাই স্কুল, পাংশার কসবামাজাইল উচ্চ বিদ্যালয়, ঢাকার নবাবগঞ্জের পাড়াগ্রাম হাইস্কুল, ফরিদপুরের ভাঙ্গার হামিরদী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, ফরিদপুরের ফুলবাড়ীয়া হাইস্কুল, মাদারীপুরের শিবচরের কাডালবার হাই স্কুল, শিবচরের রাহেলাতলা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, কালকিনির এনায়েতনগর উচ্চ বিদ্যালয়, মুন্সীগঞ্জ সদরের আলহাজ্ব এম এ খালেক আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়, মানিকগঞ্জের আবু ডাঙ্গা বজলুর রহমান উচ্চ বিদ্যালয়, গাজীপুরের শ্রীপুর আলহাজ্ব ধুনাই বেপারী মেমোরিয়াল, ঢাকা জিরানীর বিকেএসপির পাবলিক হাইস্কুল, রাজধানীর বনানী মডেল স্কুল সহ অন্তত পাঁচ শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামের তালিকা শিক্ষাবার্তা’র হাতে রয়েছে। যেখান থেকে তিনি টাকা নিয়েছেন।
অফিস সহায়ক মোতালিবের হাতে লেখা সাংকেতিক চিহ্নে যেসব প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা নিয়েছেন এসব প্রতিষ্ঠানের অন্তত ২০ থেকে ২৫ শিক্ষক-কর্মচারী এবং প্রধান শিক্ষকের সাথে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তারা নাম প্রকাশ করে কিছু বলতে সাহস করেনি। তাদের ভাষ্য নাম প্রকাশ পেলে, স্কুলের কোনো কাজে আঞ্চলিক অফিসে গেলে সেই ফাইল তারা আটকে রাখবেন। তবে এসব শিক্ষক-কর্মচারী এবং প্রধান শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে অকটপটে অর্থ লেনেদেনের বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে তাদের দাবি তারা নিরুপায় হয়েই মোতালেবকে টাকা দিয়েছেন। তা না হলে ফাইল আটকে রাখেন তিনি।
এসব শিক্ষকরা জানান, এনটিআরসিএ’ থেকে নিয়োগ প্রাপ্ত শিক্ষকরাও মোতালেবের হাত থেকে রক্ষা পাননা। তাদেরও টাকা দিতে হয়। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পরেন নাম সংশোধন এবং এমপিও পরিবর্তন/কর্তন করা শিক্ষকদের। টাকা ছাড়া এই কাজ হবেই বলে হুমকি দিয়ে এক প্রকার জিম্মি করে টাকা আদায় করেন তিনি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অফিস সহায়ক মো: আব্দুল মোতালেব গত পাঁচ বছর ধরে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার ঢাকা আঞ্চলিক উপ-পরিচালকের কার্যালয়ে কর্মরত রয়েছেন। এর আগে তিনি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা এবং সর্বশেষ রাজধানীর আরমানিটোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি বাণিজ্যসহ একাধিক অনিয়মের কারণে তাকে সেখান থেকে বদলি করা হয়।
এরপর তিনি বদলি হন নিউ গভর্নমেন্ট গার্লস হাইস্কুলে। সেখানেও একই কর্মকান্ড করতে থাকায় তাকে বদলি করা হলে তিনি ঢাকা উপ-পরিচালকের কার্যালয় বদলি করিয়ে নেন। সেই থেকে এখানে কর্মরত।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অফিস সহায়ক মোতালেবের বাড়ি রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলার হাবাসপুর ইউনিয়নের চর ঝিকড়ি গ্রামে। অতি দরিদ্র পরিবারের সন্তান মোতালেব কোনভাবে অফিস সহায়কের চাকরি পেয়ে বাড়ীতে তিন তলা ফাউন্ডেশন দিয়ে গড়েছেন আলিশান বাড়ি। নিজ গ্রামেও তিনি জমিক্রেতা বলে গড়েছেন খ্যাতি। এছাড়াও পাংশা পৌরসভাতেও রয়েছে তার জমি। রাজধানীর কেরানীগঞ্জে কিনেছেন প্লট।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপ-পরিচালকের কার্যালয়ের এক কর্মচারী বলেন, আগের এক ডিডির অফিসে ফাইল নেওয়া আনার কাজ করতেন। সেই থেকেই তিনি গড়েছেন অঢেল সম্পদ। তাকে আর পিছে তাকাতে হয়নি। আর কাঁচা টাকার লোভে এখন তিনি সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহার করে লেখেন ডাইরি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অফিস সহায়ক মো: আব্দুল মোতালেব শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, প্রথমেই টাকা নেওয়ার বিষয় অস্বীকার করেন। সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহার করে অর্থ লেনদেনের তার হাতের লেখা একাধিক চিরকুট শিক্ষাবার্তা’র হাতে রয়েছে উল্লেখ করলে তিনি বলেন, এটা হয়ত আগের এক সময়ে আমিও যে নিতাম না কিছু তা নয়। তবে গত দুই তিন মাসে আমি আল্লাহর কাছে মাফ চেয়ে এর মধ্যে আর নেই। একটাকাও লেনদেন করিনা এখন। তিনি বলেন, আমি গরিব মানুষ। এর মধ্যে আমি আর নেই।
আপনার বাড়িতে তিন তলার ফাউন্ডেশন দিয়ে করা আলিশান বাড়ি, কেরাগঞ্জে প্লট, এলাকার একাধিক জায়গায় জমি এগুলো থাকা স্বত্বেও আপনি কীভাবে নিজেকে গরিব দাবি করেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আসলে আমার চাকরি নিয়ে মামলা ছিল প্রায় ১৫ বছর বেতন পায়নি। সে টাকা একসাথে পেয়ে সেটা দিয়ে কিছু করেছি। সবশেষ তিনি প্রতিবেদকের সঙ্গে দেখা করার জন্য বলেন।
এ বিষয়ের জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার ঢাকা আঞ্চলিক উপ-পরিচালকে (ভারপ্রাপ্ত) ড. মো: মোস্তাফিজুর রহমান শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, এই অফিসে আগে কি হয়েছে তা তো আমি বলতে পারব না। আমি আসার পর এখানে সবধরনের কাজ হয় অনলাইনে। কারও ফাইলে কোনো সমস্যা থাকলে সেই ফাইল রিজেক্ট করা হয়। অর্থ লেনদেনের কোনো সুযোগ নেই।
অফিস সহায়ক আব্দুল মোতালেব আপনার পিএ পরিচয় দিয়ে শিক্ষক-কর্মচারীদের জিম্মি করে টাকা নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, এই বিষয়ে আমার কাছে কেউ লিখিত অভিযোগ করেনি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
ড. মো: মোস্তাফিজুর রহমান ঢাকা আঞ্চলিক কার্যালয়ের অন্তর্গত বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের আহ্বান জানান, তার অফিসে কোন টাকা লেনদেন না করার জন্য। কেউ যদি অনৈতিক সুবিধা নিতে তাদেরকে চাপ প্রয়োগ করে বা ফাইল আটকে রাখার কথা বলে তা তারা যেন তাকে জানান। তিনি বিধি মোতাবেক তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিবেন।